দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় এই প্রভাবশালী চক্রটি দিন-রাত শিমুল বাগান সংলগ্ন যাদুকাটা নদীর পাড় কেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে আসছিল। অনুসন্ধানে জানা যায়, চক্রটি রাতের আঁধারে নিষিদ্ধ শক্তিশালী ড্রেজার ও বোমা মেশিন ব্যবহার করে নদীর তলদেশ ও পাড় কাটছে। আর এই অপরাধের দায় বারবার চাপানোর অপচেষ্টা করা হতো সাধারণ সনাতন (ম্যানুয়াল) পদ্ধতির শ্রমিক ও বৈধ ইজারাদারের ওপর।
নদীতে সনাতন পদ্ধতিতে কর্মরত বালু শ্রমিক মো: রমজান আলী, বাসু মিয়া ও মো: একলাস নূর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা ইজারাদারের নির্ধারিত সীমানায় থেকে হাত দিয়ে, সেউতি দিয়ে বালু তুলে কোনোমতে পেটের ভাত জোগাড় করি। কিন্তু কিছু অবৈধ ড্রেজার ব্যবসায়ী রাতের অন্ধকারে নদীর পাড় কেটে নিজের আখের গোছাচ্ছে, আর বদনাম হচ্ছে আমাদের ও ইজারাদারের। এই দানবীয় ড্রেজারের কারণে নদী ও শিমুল বাগান ধসে যাচ্ছে। আমাদের কাজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, পেটে লাথি মারা হচ্ছে। আমরা এখানে কাজ না পেয়ে ঢাকা বা অন্য কোথাও গিয়ে দিনমজুর খাটতে বাধ্য হচ্ছি। যারা ড্রেজার চালিয়ে নদী ধ্বংস করছে, তাদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।
এবার প্রকৃত অপরাধী ও অবৈধ বালু খেকোদের রুখতে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে ইজারাদার কর্তৃপক্ষ। সরেজমিনে যাদুকাটা ১ ও ২ নম্বর মহালে দেখা গেছে, নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে বালু উত্তোলন ও পাড় কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ইজারাদারের পক্ষ থেকে বাঁশ দিয়ে নদীর পাড় এলাকায় শক্তিশালী ‘আড়ি’ বা বেড়া দেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো নৌকা বা ড্রেজার পাড়ের কাছে ঘেঁষতে না পারে। একই সাথে নদী তীরবর্তী এলাকায় বড় বড় ব্যানার ও ফেস্টুনে লাল সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে ইজারাদার প্রতিনিধি মো: লোকমান মিয়া ও সাজ্জাদ মিয়া জানান, যাদুকাটা ১ ও ২ নম্বর মহাল সরকারি নিয়মানুযায়ী ইজারা হয়েছে এবং এখান থেকে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করে তাদের জীবিকানির্বাহ করছে। কিন্তু কিছু দুষ্কৃতিকারী রাতের আঁধারে ইজারাকৃত সীমানার বাইরে গিয়ে শিমুল বাগান ও ঘাগটিয়ার পাড় কেটে নিয়ে যাচ্ছে। ইজারাদারের পক্ষ থেকে বহুবার তাদের বাধা দেওয়া হয়েছে। আমরা আইনের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। কোনো অবস্থাতেই যাদুকাটা নদীর পাড় বা শিমুল বাগানের ক্ষতি করে বালু তুলতে দেওয়া হবে না।
এ ব্যাপারে যাদুকাটা ১ ও ২-এর ইজারাদার শাহ্ রুবেল তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও পরিবেশ রক্ষার জন্য নদীর পাড় কাটা রোধ এবং দর্শনীয় শিমুল বাগানকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে আমরা সরকারের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব দিয়ে নিয়ম মেনে মহাল ইজারা নিয়েছি। কিন্তু স্থানীয় একটি চিহ্নিত প্রভাবশালী চক্র আমাদের ব্যবসার ভাবমূর্তি নষ্ট করতে এবং শিমুল বাগান ধ্বংস করতে উঠেপড়ে লেগেছে। আমরা স্পষ্ট করে দিতে চাই, বৈধ সীমানার বাইরে এক ইঞ্চি জায়গাও কাউকে ছুঁতে দেওয়া হবে না। আমরা নিজেদের খরচে নদীর পাড়ে বাশঁ দিয়ে বেড়ার কাজ চলমান রয়েছে এবং নিজস্ব পাহারাদার বসিয়েছি। এর আগে জেলা প্রশাসক বরাবরে আমরা রাতের আধাঁরে নদীর পাড় কাটা এইসব অবৈধ বালু লুটকারীদের বিরুদ্ধে ৮/১০ টি লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। প্রশাসনকে আমরা অনুরোধ করেছি, যেন রাতের আঁধারে যারা ড্রেজার চালায়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আমরা ইজারাদার কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করছি আইন অমান্যকারী সে যে-ই হোক, তাকে সাথে সাথে আইনের হাতে সোপর্দ করা হবে।এই বালু চুরির চক্রটিকে দমনে পুলিশ প্রশাসন কতটা তৎপর, তা উঠে এসেছে জেলার শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্যে। তবে আইনের একটি বড় ফাঁক এই অপরাধীদের বারবার পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।
এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন (পিপিএম) বলেন, যাদুকাটা যে বালুমহালটি আছে এটি স্থানীয় জেলা প্রশাসন থেকে ইজারা দেওয়া হয়। যারা ইজারা পায় তারা বেশ কিছু শর্তের মধ্যে বালু আহরণ করার কথা, কিছু শর্ত তারা মানছেন আবার কিছু মানছেন না। নদীর তীর কাটা, অবৈধ বালু উত্তোলন করা এসব বিষয়ে বারবার আমরা জেলা প্রশাসনের সাথে কথা বলেছি এটা বন্ধ করার করণীয় নিয়ে। আমরা প্রতিনিয়ত মামলা দিচ্ছি, গত জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত আমরা ৬৬ টি মামলা দিয়েছি এরমধ্যে ৩৭৫ জন এজাহার ভুক্ত ও এজাহার বহির্ভূত সবমিলিয়ে ৭২০ জন। আমরা গ্রেফতার করেছি ৬০ জন। কিন্তু মূল সমস্যা হলো, ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ (সংশোধনী ২০২৩)’ অনুযায়ী এই অপরাধটি জামিনযোগ্য । ফলে আমরা আসামিদের আদালতে পাঠালেও তারা দ্রুত জামিনে বের হয়ে আসে এবং জব্দকৃত মালামাল বা নৌযান নিয়ে আবারও একই অপরাধে লিপ্ত হয়। তিনি আরও যোগ করেন, এটা বন্ধ করতে হলে আমাদের সবাইকে সম্মিলিত ভাবে কাজ করতে হবে। টাস্কফোর্স ও মোবাইল কোর্টকে আরও কার্যকর করতে পারলে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে অবৈধ নৌযানগুলো স্পটেই ধ্বংস করে দিতে পারব, তখন অপরাধীরা বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে এবং এই কাজ করা ছেড়ে দেবে। আর ইজারাদাররা নদীর পাড়ে বেড়া দিয়ে যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ইজারাদাররা যদি রাতে বালু কাটা সম্পূর্ণ বন্ধ রেখে কেবল সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কাজ পরিচালনা করেন, তবে এই মহালে দ্রুত শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।
এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল জানান,প্রশাসনের দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করে বলেন, যাদুকাটা নদী শুধু একটি বালুমহাল নয়, এটি আমাদের পরিবেশগত সম্পদ ও শিমুল বাগানের মতো বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্রের প্রাণ। অবৈধভাবে কেউ যেন নদীর পাড় কাটতে না পারে, সেজন্য জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন এবং আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা সর্বদা সতর্ক আছে প্রতিনিয়ত মোবাইল কোর্ট হচ্ছে, মামলা দেওয়া হচ্ছে। তারপরও কিছু দুষ্কৃতিকারী অবৈধভাবে পাড় কাটছে। আমরা জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন ও বিজিবি”র সদস্যরা যৌথভাবে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি এটা প্রতিরোধে টহল জোরদার করা হয়েছে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ ও প্রশাসনের অভিযানের পাশাপাশি প্রথম প্রতিরোধটা আসতে হবে স্থানীয়দের কাছ থেকে। স্থানীয় লোকজন যদি প্রথমে প্রতিরোধ না করে, তবে প্রশাসনের একার পক্ষে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, ইজারাদারদের এই বেড়া দেওয়ার উদ্যোগ ও সীমানা নির্ধারণের পদক্ষেপকে প্রশাসন স্বাগত জানায়। পরিবেশ ধ্বংসকারী যেকোনো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রশাসন শতভাগ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অটল।
ইজারাদারের নদীর পাড়জুড়ে বাশঁ দিয়ে ভেরিকেট তৈরী করা এবং প্রশাসনের এই কঠোর হুংকার মাঠপর্যায়ের প্রতিরোধ যদি শতভাগ বাস্তবায়িত হয়, তবেই বাঁচবে যাদুকাটা নদী, রক্ষা পাবে অপরূপ শিমুল বাগান। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, এখন দেখার বিষয় প্রশাসনের এই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি প্রভাবশালী বালু খেকো সিন্ডিকেটের খুঁটির জোরকে উপড়ে ফেলতে কতটা সফল হয়।