বিশ্বকাপে সৌদি আরবের নাম উচ্চারিত হলেই ফুটবলপ্রেমীদের মনে ভেসে ওঠে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সেই অবিশ্বাস্য বিকেলের ছবি। যেখানে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাকে ২-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অঘটনের জন্ম দিয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি। চার বছর পর আবারও এক ইউরোপিয়ান পরাশক্তির সামনে দাঁড়িয়েছে সৌদিরা। এবার প্রতিপক্ষ স্পেন। প্রশ্ন একটাই আরেকটি রূপকথা কি অপেক্ষা করছে?
২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘এইচ’এ দুই দলের অবস্থানই কিছুটা ভিন্ন। নিজেদের প্রথম ম্যাচে কেপ ভার্দের বিপক্ষে আধিপত্য দেখিয়েও গোলের দেখা পায়নি স্পেন। ৭৪ শতাংশ বল দখল, ২৭টি শট এবং ২.২৯ প্রত্যাশিত গোল তৈরি করেও গোলশূন্য ড্র করতে হয়েছে লা রোজাদের। অন্যদিকে, সৌদি আরবও উরুগুয়ের মতো দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের বিপক্ষে ১-১ গোলের ড্র করে আত্মবিশ্বাসী অবস্থায় রয়েছে।
তবে স্পেনের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা হতে পারে সৌদিদের অতীত। ২০২২ সালের ২২ নভেম্বর লুসাইল স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচে প্রথমে পিছিয়ে পড়েছিল তারা। মেসির পেনাল্টিতে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে সালেহ আল-শেহরি ও সালেম আল-দাওসারির গোলে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেয় সৌদি আরব। পুরো ম্যাচে মাত্র ৩১ শতাংশ বলের দখল রেখেও তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে ইতিহাস গড়ে।
শুধু সেই ম্যাচই নয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব নিজেদের রক্ষণাত্মক সংগঠন এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণের জন্য পরিচিত হয়ে উঠেছে। শক্তিশালী দলের বিপক্ষে তারা বলের দখলের লড়াইয়ে না গিয়ে জায়গা সংকুচিত করে প্রতিপক্ষকে হতাশ করার কৌশল নেয়। ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে উরুগুয়ের বিপক্ষেও সেই পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন দেখা গেছে।
অন্যদিকে স্পেনের শক্তি বরাবরের মতোই বলের নিয়ন্ত্রণ এবং ছোট ছোট পাসের সমন্বয়। তবে কেপ ভার্দের বিপক্ষে দেখা গেছে তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সুযোগ সৃষ্টি করেও শেষ মুহূর্তে গোল করতে না পারা। ফেরান তোরেসের শট ক্রসবারে লেগে ফিরে এসেছে, মিকেল ওয়ারজাবালের হেড দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়েছেন গোলরক্ষক ভোজিনহা। মোট দুইটি বড় সুযোগ তৈরি করেও গোলের খাতা খুলতে পারেনি স্পেন।
তাই স্পেনের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু সৌদি রক্ষণ ভাঙা নয়, নিজেদের ফিনিশিং সমস্যার সমাধান করাও। কারণ বিশ্বকাপের ইতিহাস বলে, আধিপত্য সবসময় জয় নিশ্চিত করে না। ২০২২ সালে আর্জেন্টিনা ১৫টি শট, ৭০ শতাংশের বেশি বল দখল এবং অসংখ্য আক্রমণ করেও সৌদি আরবের কাছে হেরে গিয়েছিল।
তবে একটি বিষয় স্পেনের পক্ষেও কথা বলে। ২০২২ বিশ্বকাপেই কোস্টারিকার বিপক্ষে ৭-০ গোলের জয় তুলে নিয়ে তারা দেখিয়েছিল, সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে।
তাই এই লড়াই শুধু স্পেনের আক্রমণ বনাম সৌদির রক্ষণ নয়, এটি বাস্তবতা বনাম স্মৃতিরও লড়াই। একদিকে ইউরোপের পরাশক্তি স্পেন নিজেদের আধিপত্যকে গোলের আনন্দে রূপ দিতে চায়, অন্যদিকে সৌদি আরব আবারও প্রমাণ করতে চায় বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় গল্পগুলো সবসময় বড় দলরাই লেখে না।
লুসাইলের সেই রাত এখনও ফুটবল বিশ্বের স্মৃতিতে অম্লান। এখন দেখার বিষয়, সৌদি আরব কি আবারও কোনো মহাতারকার দেশের স্বপ্ন ভাঙবে, নাকি স্পেন ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের পথ খুঁজে নেবে।